বিজ্ঞাপন

মোদি না রাহুল কে বড়ো রাঁধুনি!

নিশ্চয়তা বনাম আকাঙ্ক্ষা-- গুজরাট এবং হিমাচলপ্রদেশে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনি লড়াইকে এই দুটি শব্দেই পরিচ্ছন্নভাবে ভাগ করে নেওয়া যায়৷ প্রথমে আকাঙ্ক্ষার ব্যাখ্যা দিই৷ গুজরাটে রাহুল গান্ধির নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের জয় শুধু রাহুল চাননি৷ যৌথভাবে চেয়েছিলেন হার্দিক প্যাটেল, জিগ্নেশ মেবানি এবং অল্পেশ ঠাকুরের অলিখিত জোটও৷ এমনকি রাজনৈতিক অবস্থানগত বৈপরীত্য সত্ত্বেও অব্যক্ত কিন্তু প্রবলভাবে চেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস, সীতারাম ইয়েচুরি’র নেতৃত্বাধীন সিপিএম সহ অন্যান্য ক্ষুদ্র বামদলগুচ্ছ, অখিলেশ যাদবের খণ্ডিত সমাজবাদী পার্টি, মায়াবতী’র বহুজন সমাজ পার্টি, বিহারি যাদব কুলপতি’র রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং সংযুক্ত জনতা দলের খারিজ হয়ে যাওয়া ক্ষুদ্রতর শরদ যাদব গোষ্ঠীও৷ এমনকি জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা’র (এনডিএ) বহু পুরোনো শরিক শিবসেনাও৷ অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষার জোরে লক্ষণীয় তীব্রতা ছিল৷ কিন্তু আমাদের জীবনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা হয় গুজরাটেও তা হয়েছে৷ অর্থাৎ নিশ্চয়তার জয় হয়েছে৷

২২ বছর মসনদে কাটিয়ে দেওয়ার পরেও বিজেপি যে গুজরাট ফের জিতবে তা নিয়ে নিশ্চয়তার অভাব ছিল না বিন্দুমাত্র৷ এমনকি কংগ্রেসের একাধিক মুখপাত্রও ঠারেঠোরে বারবারই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন গুজরাটে বিজেপিকে যতটা সম্ভব কাবু করাই তাদের লক্ষ্য৷ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গুজরাট জিতে যাবেন ভোটের স্বাভাবিক প্রচারের জন্য প্রয়োজনটুকু ছাড়া এ দাবি তাঁরাও করেননি৷ আকাঙ্ক্ষা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়৷ কিন্তু রাহুলের ত্রিফলা-- হার্দিক, জিগ্নেশ, অল্পেশ কিন্তু জানপ্রাণ দিয়ে লড়াইটা করেছিলেন৷ বিজেপি’কে হারানোর সব আকাঙ্ক্ষা এবং বিজেপি শেষপর্যন্ত জিতবে সেই নিশ্চয়তা মেনে নিয়েও৷ কিন্তু এই চারমূর্তি ছাড়া বাকিদের আকাঙ্ক্ষাটা ছিল অনেকটা কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টে ব্রাজিল বনাম উরুগুয়ে ম্যাচ উপভোগ করা বাঙালি (অথবা ধরে নেওয়া যাক ভারতীয়) আর্জেন্টিনা সমর্থক দর্শকদের মতো৷ আকাঙ্ক্ষা চাইছে উরুগুয়ের স্ট্রং মিডফিল্ড বা ফরোয়ার্ড লাইনের কাছে ব্রাজিল হারুক৷ কিন্তু যুক্তি বলছে ব্রাজিল খানিকটা টোল খেলেও নিজেদের ঘরের মাঠে ম্যাচটা ঠিক বের করে নেবেই এবং শেষ পর্যন্ত তাই-ই হ’ল৷



হিমাচলপ্রদেশে অবশ্য আকাঙ্ক্ষা নিশ্চয়তাকে ছাপিয়ে যায়নি কখনই৷ উত্তর ভারতের এই ক্ষুদ্র রাজ্যটিতে গত চল্লিশ বছর ধরে (অর্থাৎ বিজেপি’র জন্মের তিন বছর আগে থেকেই) প্রতিটি বিধানসভা নির্বাচনে রুটিন মেনে রাজনৈতিক পালাবদল হয়ে এসেছে৷ সুতরাং এই রাজ্যে ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে কংগ্রেস তো বটেই পরোক্ষে বিজেপি’র পরাজয় হলে খুশি হতে চাওয়া দলগুলিরও খুব একটা প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষা ছিল না৷ এমনকি এত নিশ্চয়তার পরেও যে, গুজরাটে দুর্গ টিকিয়ে রাখতে কালঘাম বইয়েছেন নরেন্দ্র মোদি বা অমিত শাহ৷ তাঁরাও হিমাচলে এলেবেলেভাবেই জয়টা আসবে বলে নিশ্চিত থাকায় গা’টুকুও ঘামাননি৷ সুতরাং হিমাচলপ্রদেশে নিশ্চয়তার তুলনায় আকাঙ্ক্ষার জোর অকিঞ্চিৎকর হওয়ায় লড়াইটা জমেনি৷ একপেশে হয়েছে৷

এবার যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে তা হ’ল গান্ধি (মোহনদাস করমচাঁদ নন) বংশের তৃতীয় পুরুষের জাতীয় রাজনৈতিক ময়দানে ‘উদয়’৷ একটু গভীরে ডুব দিলে দেখা যাবে গুজরাটে রাহুল মোদি’কে খানিকটা ‘হুল’ ফুটালেও দেশের বৃহত্তম নির্বাচনি মানচিত্রে কংগ্রেস এবং রাহুল এখনও ‘রাহু’গ্রাসেই৷ গুজরাটে যত সহজে হার্দিক-জিগ্নেশ-অল্পেশ’কে রাজনৈতিক চরিত্রের বৈপরীত্য সত্ত্বেও ঘুরপথে অলিখিতভাবে একমঞ্চে আনা সম্ভব হয়েছিল, দেশব্যাপী এনডিএ বিরোধী সর্বাত্মক জোট করাটা ততটা সহজ নয়৷ সিপিএম-তৃণমূল, সমাজবাদী-বহুজন সমাজ পার্টি, শিবসেনা-এনসিপি, এআইএডিএমকে-ডিএমকে এমনকি পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-তৃণমূলও এনডিএ (অর্থাৎ বিজেপি) মুক্ত ভারত চাইলেও নিজস্ব রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটিগুলিতে নির্বাচনে একে অপরকে ধূলিসাৎ করতে চেষ্টার কসুর করবে না৷ স্বভাবতই এমন পরস্পরবিরোধী যুযুধান দলগুলিকে নিয়ে দেশ জোড়া এক অদ্ভুত জোট সম্ভব হলেও বিজেপি তাড়ানোর লক্ষ্যে তা কতটা কার্যকরী হবে, তা নিয়ে সন্দেহের বিপুল অবকাশ থেকে যায়৷

সন্দেহ থাকলে সম্ভাবনাও থাকে৷ গুজরাট এবং হিমাচলপ্রদেশের বিজেপি ভারসাস কংগ্রেস ম্যাচ ভুলে ভোটপাখির চোখ এখন আগামী রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, ছত্তিশগড় সহ সাতটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে৷ লোকসভা নির্বাচনের আগে এই সাতটি রাজ্যের নির্বাচনি ফলাফল বিপুলভাবে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনতে পারে রাহুল-রাজ’কে৷ কিংবা ফের একবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নিশ্চিত করতে পারে মোদি জমানাকে৷

রাজস্থানেও গুজরাটের মতোই হাড্ডাহাড্ডি চ্যালেঞ্জের মুখে বিজেপি৷ মধ্যপ্রদেশে পরিস্থিতিও প্রায় অনেকটাই একইরকম৷ ২০০০ সালে গঠিত হওয়া ছত্তিশগড়েও একটানা ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার রাজনৈতিক সমীকরণ যথেষ্ট শক্তিশালী৷ অন্যদিকে, ১৯৯৩ সাল থেকে প্রায় সিকি শতাব্দী ক্ষমতায় থাকা বাম সরকারের বিরুদ্ধেও সেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকেই তুরুপের তাস করে প্রবল বেগ দিতে নেমে পড়েছে বিজেপি৷ কর্ণাটকেও ক্ষমতাসীন কংগ্রেস বনাম বিরোধী দল বিজেপি’র লড়াইটা উপভোগ্য হতে চলেছে৷ মিজোরামে টানা দু’টি বিধানসভায় জিতে আসা কংগ্রেসকে বেগ দিতে পারে এনডিএ’র সমর্থক নর্থ ইস্ট রিজিওনাল পলিটিক্যাল ফ্রন্ট৷ নাগাল্যাণ্ডেও এই ফ্রন্টেরই ক্ষমতা ধরে রাখার সম্ভাবনা যথেষ্ট৷

তবে এই রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছাপ ফেলবে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং কর্ণাটক৷ এই তিন টেক্কার মধ্যে অন্তত দু’টি কংগ্রেস তুলে নিতে পারলেই প্রায় টলতে শুরু করবেন নরেন্দ্র-অমিত জুটি৷ অন্যদিকে, রাজস্থান বা মধ্যপ্রদেশ কিংবা ছত্তিশগড়ের মধ্যে যেকোনো একটি বা দু’টি হারিয়ে বিজেপি যদি কেড়ে নিতে পারে কর্ণাটক এবং সঙ্গে ত্রিপুরাও তবে ‘অউর একবার মোদি সরকার’ প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে৷ যদিও তা ২০১৪’র মতো কংগ্রেসকে প্রায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে নয়৷ সুতরাং গুজরাট বা হিমাচলপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে যতই মাতামাতি হোক, আসলে তা কোয়ার্টার ফাইনালও নয়৷ বড়োজোর ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ অফ ডেথ-এ শীর্ষস্থান দখলের লিগ ছিল৷ তাতে আপাতত কিছুটা হলেও এগিয়ে বিজেপি’ই৷

কোয়ার্টার ফাইনাল বা সেমিফাইনাল খেলাটা এই সাত রাজ্যের নির্বাচনই৷ যুবরাজ থেকে কংগ্রেসের সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠা রাহুল গান্ধির কাছে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হল-- ‘এখনও কংগ্রেসই পারে’ এই শক্তি বাস্তবিকই প্রমাণ করে নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী এজেন্ডার রাজনৈতিকদলগুলিক যেকোনো মূল্যে প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে নিজের শিবিরে টেনে কর্ণাটককে নিজেদের দখলে রেখে রাজস্থান বা মধ্যপ্রদেশ সহ আরও অন্তত তিনটি রাজ্যে জয়লাভ করা৷

অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদির চ্যালেঞ্জ-- রাজস্থান, ছত্তিশগড় এবং মধ্যপ্রদেশের মধ্যে তিনটি রাজ্যই বিজেপি’র দখলে রাখা কিংবা যেকোনো দু’টি রাজ্য ফের জিতে নিয়ে কর্ণাটক ছিনিয়ে আনা৷ এগুলোর পরে ত্রিপুরাও যদি আসে তবে তথাকথিত ৫৬ ইঞ্চি বেড়ে বড়োজোর ষাট হতে পারে৷ তার বেশি কিছু নয়৷

চোখে চোখ রেখে এই লড়াইয়ে রাহুলের কাছে ‘নরম হিন্দুত্ব’, স্থানীয়স্তরের চমকে দেওয়া কিছু নবীন মুখ তুলে আনা সহ বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত স্ট্র্যাটেজি আশা করা যেতে পারে৷ নরেন্দ্র-অমিত কিন্তু ফের ভরসা রাখবেন ‘প্রবল জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘চড়া’ হিন্দুত্বের ককটেল করে সেই ডিভিডেন্ড দেওয়া পুরোনো কিন্তু ধারাবাহিক অঙ্কেই৷

গুজরাট, হিমাচলপ্রদেশ কিন্তু তাই দ্রুত অতীত হচ্ছে৷ সাত রাজ্যের আগামী নির্বাচনই বলে দেবে সাত রঙের বৈচিত্র্য নিয়ে রাহুল উদিত হলেন নাকি দেশ এখনও মোদিকে নিয়েই ‘আমোদিত’৷

বিজ্ঞাপন

Malda Guinea House.jpg

পপুলার

1

শীতের বনভোজনে ইংরেজবাজারে নিষেধাজ্ঞা পুলিশের

Popular News

794

শীতের বনভোজনে ইংরেজবাজারে নিষেধাজ্ঞা পুলিশের
2

গ্রেফতার সাত ডাকাত, উদ্ধার হাঁসুয়া, লোহার রড

Popular News

679

গ্রেফতার সাত ডাকাত, উদ্ধার হাঁসুয়া, লোহার রড
3

মানিকচকে গঙ্গায় ডুবল ভেসেল, সার্চলাইট জ্বালিয়ে খোঁজ

Popular News

625

মানিকচকে গঙ্গায় ডুবল ভেসেল, সার্চলাইট জ্বালিয়ে খোঁজ
4

সুজাপুরে বিস্ফোরণস্থলে এলেন ফিরহাদ হাকিম, আসছে ফরেনসিক দল

Popular News

703

সুজাপুরে বিস্ফোরণস্থলে এলেন ফিরহাদ হাকিম, আসছে ফরেনসিক দল
5

তীব্র বিস্ফোরণ সুজাপুরের প্লাস্টিক কারখানায়

Popular News

1306

তীব্র বিস্ফোরণ সুজাপুরের প্লাস্টিক কারখানায়
Earnbounty_300_250_0208.jpg
At the Grocery Shop
টাটকা আপডেট
কমেন্ট করুন
 

aamadermalda.in

সাবস্ক্রিপশন

স্বত্ব © ২০২০ আমাদের মালদা

  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Pinterest
  • RSS