top of page

ঘর গেরস্থালির সঙ্গে এবার গঙ্গা কেটে নিচ্ছে মহিলা শিক্ষার শিকড়ও

অর্থনীতিতে আগেই ধাক্কা মেরেছে। সমাজ ব্যবস্থা যেন ছিঁড়ে ফেলেছে। এবার শিক্ষাক্ষেত্রেও হাতুড়ির ঘা বসাল গঙ্গা। একটা নদী কীভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তা যেন সারা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিচ্ছে কালিয়াচক ৩ নম্বর ব্লকের বীরনগর ১ নম্বর গ্রামপঞ্চায়েতের সরকারটোলা, চিনাবাজার, মহেন্দ্রটোলা, ভীমাগ্রামের মতো নদীর ধারে থাকা গ্রামগুলি। দিনে কিংবা রাতে, গঙ্গা কখন যে তার চেরা জিভ বের করে সব কিছু নিজের জঠরে টেনে নেবে, তা কেউ জানে না। আবহবিজ্ঞানেও তার কোনও পূর্বাভাস মেলে না। কিন্তু যখন তাণ্ডব থামে, মানুষের কান্নামাখা এলোমেলো বাতাস বুঝিয়ে দেয়, সে এসেছিল, সব গ্রাস করে সে এখন শান্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই শান্তি কতক্ষণের, তা জানা নেই কারও।

Sarkartola-Mahendratola-Bhimagram-saw-destruction-of-ganga-yesterday
২৪ ঘণ্টায় তলিয়েছে ৪০০ বাড়ি, গঙ্গার গ্রাসে এবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

গতকাল দফায় দফায় পুণ্যতোয়ার সংহাররূপ দেখেছে সরকারটোলা, মহেন্দ্রটোলা আর ভীমাগ্রাম। সকাল তখন ছ’টা। অন্য দিনের মতো স্বাভাবিক ছন্দেই ঘুম ভেঙেছিল তিনটি গ্রামের। হঠাৎ নদীতে শুরু হল ঘূর্ণি। সাদা ফেনা জলের উপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নদীপাড়ে নীচ থেকে উপরে উঠে আসছে বুদবুদ। নদীর গতিপ্রকৃতির ধারণা থাকা অভিজ্ঞদের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। মুহূর্তে তাঁরা চিৎকার করে ওঠেন। বাড়ি থেকে সব জিনিস সরাও। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। শিবের জটা থেকে মুক্ত গঙ্গা আছড়ে পড়েছে পাড়ে। একে একে ধসে পড়ছে পাকা বাড়িঘর। নদীর অতলে চলে যাওয়ার পর জায়গাটাই নিশ্চিহ্ন। ঘুরতে ঘুরতে নদীগর্ভে মিলিয়ে যাচ্ছে বাঁশের ঝাড়, আমগাছ। সেসব কোথায় চলে যাচ্ছে, বোঝা দায়। ঘরের জিনিস উদ্ধার করার কথা ভাবার সময় নেই তখন। আগে জীবন। সেটা বাঁচাতেই মানুষের দৌড়ঝাঁপ। এভাবেই পেরিয়ে গিয়েছে টানা পাঁচ ঘণ্টা। তারপর তীব্রতা কমলেও রাত ১১টা পর্যন্ত সরকারটোলায় পাড় কেটেছে গঙ্গা। রাতে তার রুদ্ররূপ দেখেছে ভীমাগ্রাম। সেখানে তলিয়ে গিয়েছে ৬০-৭০টি বাড়ি। আজ দুই গ্রামেই শুধু হাতুড়ির আওয়াজ। যা বেঁচে আছে, তা বাঁচিয়ে রাখার তীব্র লড়াই। নদীর গতির থেকে আগে সেই কাজ করতে হবে যে!


শুধু গেরস্থদের জীবনগাথায় নয়, গঙ্গার তাণ্ডবে সংকটের মুখে বীরনগর ১ নম্বর গ্রামপঞ্চায়েতের মহিলা শিক্ষা ব্যবস্থাও। এই মুহূর্তে নদীর উপর ঝুলছে বীরনগর গার্লস হাইস্কুলের একাংশ। স্থানীয় পবন মণ্ডল জানাচ্ছেন, “আর কিছুতেই রক্ষা করা যাবে না। এই স্কুল এবারই নদী গিলে নেবে। কয়েক বছর ধরে নাগাড়ে ভাঙন চলছে। প্রতি বছর। অথচ কোনও সরকারই কিছু করছে না। এমন চলতে থাকলে এই এলাকাটাই আর মানচিত্রে থাকবে না।” নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে থাকা সেই স্কুলেই আশ্রয় নিয়ে রয়েছে ৩০টি পরিবার। তাঁদের বক্তব্য, গঙ্গা অনেক দৌড় করিয়েছে। আর কেউ দৌড়োতে পারছেন না। যদি নদী স্কুলের সঙ্গে তাঁদেরও নিজের গর্ভে টেনে নেয়, তবে নিক। তাঁরা এই আশ্রয় থেকে আর সরবেন না।

বিপন্নদের অভিযোগ, গতকাল থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত প্রশাসনের কেউ তাঁদের কাছে আসেননি। তাঁদের কথা শোনেননি। ঘরহারাদের একটা ত্রিপলও জোটেনি। ভরা ভাদরে খোলা আকাশের নীচে দিন কাটানো কত কষ্টের, প্রশাসনের কর্তারা বোধহয় বোঝেন না। তাঁরা যে ঠাণ্ডা ঘরে থেকে অভ্যস্ত। তাঁরা কী খাবেন, কী পরবেন, কীভাবে নতুন জীবন শুরু করবেন, কারও জানা নেই। সবাই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে।




যদিও কালিয়াচক ৩ নম্বর ব্লকের বিডিও মামুন আখতার জানিয়েছেন, আজ তিনি ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে এসেছেন। ক্ষয়ক্ষতির রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। বিপন্নদের ত্রাণ বিলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আজ থেকেই দুর্গতরা ত্রাণ পেতে শুরু করবেন।


আমাদের মালদা এখন টেলিগ্রামেও। জেলার প্রতিদিনের নিউজ পড়ুন আমাদের অফিসিয়াল চ্যানেলে। সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

বিজ্ঞাপন

Malda-Guinea-House.jpg

আরও পড়ুন

bottom of page