হীরের আংটি এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের আত্মপ্রকাশঃ পঁচিশ বছর পর ফিরে দেখা


আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগে ১৯৯২ সালে সত্যজিৎ রায় আমাদের ছেড়ে চলে যান। সিনেমাকে শিল্প হিসেবে দেখেন এমন সিনেপ্রেমিরা চিন্তায় পড়লেন, তাহলে কি শিল্পের 'শাখা প্রশাখা' ছেঁটে দিয়ে সত্যজিৎ পরবর্তী বাংলা ছবি শাসন করবে 'বড়বউ', 'মেজবউ', 'ছোটবউ' আর 'নবাব'! 'জলসাঘর' এর দখল নেবে মতাদর্শহীন নিম্নমেধার পরিচালকেরা? কিন্তু সেবছর এরকমই পুজোর আবহে বাংলার সিনেমহলে আগমন ঘটে এক আভাগাদ 'আগন্তুক'এর। ঋতুপর্ণ ঘোষ। ছবির নাম ছিল 'হীরের আংটি'।

ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর প্রথম ছবি ‘হীরের আংটি’ তৈরি করেছিলেন মূলত শিশুদের জন্য। প্রযোজনা করেছিল চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি অব ইন্ডিয়া। প্রথম ছবিতেই ইঙ্গিত পাওয়া যায় ঋতুপর্ণর গল্প বলার নিজস্ব রীতি আছে যা পরবর্তী ছবিগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়। বাংলা ছবিতে এক নূতন শিল্পসম্মত ও রুচিশীল চলচ্চিত্র-ভাষার সূচনা হতে চলেছে তার আগাম আভাস পাওয়া যায় হীরের আংটিতে। ছবির শুরুতে ঋতুপর্ণ যথেষ্ট সময় নিয়ে বেশ যত্নের সঙ্গে গল্পের আবহ তৈরি করেন। কোন তাড়াহুড়ো নেই, নবীন পরিচালক একটু যেন সাবধানী।

পিতৃপক্ষের শেষ, দেবীপক্ষের শুরু। গ্রামের এক অভিজাত বনেদি বাড়ি। সময় সকাল। রেডিওতে চণ্ডীপাঠ হচ্ছে। ঠাকুরদালানে দেবীপ্রতিমায় শেষ তুলির টান চলছে। ঢাকিরা এসে গেছে। শহরে লরিতে করে দেবী আসে ঘরে। কিন্তু গ্রামের বনেদি বাড়িতে প্রতিমা নির্মাণ হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে এই বাড়ির দেবীর বাহন সিংহ নয়, ঘোড়া। পরিচালক আমাদের জানান দেন যে দেবী দুর্গার রূপ বহু বছর ধরে পাল্টেছে। শুরুতে তাঁর বাহন যেমন সিংহ ছিল না, তেমন সময়ের সঙ্গে বেড়েছে হাতের সংখ্যাও। বুঝতে পারি নবীন পরিচালকের সাংস্কৃতিক জ্ঞান যথেষ্ট, তিনি তাঁর অরগ্যানিক দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

ছবির শুরুতে এক জায়গায়, বাড়ির কর্তা রতনলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বহু পুরোনো চাকর এবং সঙ্গী পাঁচুকে বলছেন, ‘ভাবছি ছুটি ফুরোলে ওর (মেজ ছেলে) সঙ্গে আমেরিকা ফিরে যাবো... তোকেও নিয়ে যাব।’

-- ‘আমি যাব না।’

-- ‘ওদেশেও পুজো হয়, খুব ঘটা করে।’

-- ‘ঢাক বাজে? কাশফুল ফোটে?’

এই শেকড় না ছেড়ে যাওয়ার গল্প হীরের আংটি। হাবুল আর তিন্নির মত আরও অনেকের শৈশবের গল্প। হাবুল আর তিন্নির সঙ্গে তাদের ছোটকার সম্পর্ক, গেনুদার সঙ্গে কাটানো মজাদার অলস দুপুর আমার মত বহু দর্শকের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে মনে পড়াবে। এই শৈশবে স্মার্ট ফোন নেই, স্মার্ট সিটি নেই, কিন্তু রাজপুত্র গন্ধর্বনারায়ণ আছে, ঘোড়া আছে, সৈন্য সামন্ত আছে, রাজ্যপাট আছে, কৌতূহল আছে, আছে জিজ্ঞাসা। হীরের আংটি, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের উপর জোর দেয়। গেনুদা একা মানুষ, বিপথগামী হয়েছিল। হাবুল আর তিন্নির সংস্পর্শে সে অন্য মানুষ হয়ে গেল! সব লোভ বিসর্জন দিল, এমনকি দামী হীরের আংটিটাও চলে যাবার সময় হাবুলকে দিয়ে গেল ভালোবাসার ‘অভিজ্ঞান’ হিসেবে। এই লোভ না করতে শেখার গল্প বলে হীরের আংটি। পৃথিবীর এই গভীর অসুখের সময়েও, পঁচিশ বছর আগের 'হীরের আংটি' আমাদের ভালো মানুষ হয়ে ওঠার প্রেরণা দেয়। ষষ্ঠী গ্রামের নামকরা ছিঁচকে চোর, স্বপ্ন দেখে একদিন 'কালীমাতা সহায় ডাকাতদলের' মালিক হবে! এই সাঙ্ঘাতিক মব-লিঞ্চিং এর সময়েও তার উপর আমাদের রাগ হয়না, বরঞ্চ একদলা মমতা জাগে এই প্রান্তিক মানুষটার জন্য। মনে হয় কোথায় হারিয়ে গেল এই ছিঁচকে চোরেরা! অজান্তে তাদের ফিরে পাওয়ার ইচ্ছেই মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে!

প্রথম ছবিতেই ঋতুপর্ণর ডিটেলিং ভাবনা অবাক করে। বনেদি বাড়ি, চণ্ডীমণ্ডপ, বড় উঠোন, দামি কাঠের খাট ইত্যাদি মিলিয়ে এক পুরনো বাঙালিয়ানা যা আমাদের নস্টালজিক করে। প্রতিটি দৃশ্যে যেখানে যেটা যেমনটি থাকা দরকার সেটা তেমনই আছে, কোথাও ভুলচুক নেই। বুঝতে পারি শিল্পের প্রতি তিনি যথেষ্ট যত্নশীল। হীরের আংটির প্রতিটি ফ্রেম জুড়ে এই যত্নের ছাপ স্পষ্ট।

দুলাল লাহিড়ির অপরিণত অভিনয় বাদ দিলে একজন নবীন পরিচালক হিসেবে বসন্ত চৌধুরি, জ্ঞানেশ মুখার্জি, বরুন চন্দ, শকুন্তলা বড়ুয়ার মত সিনিয়র অভিনেতাদের দিয়ে নিয়ন্ত্রিত অভিনয় করিয়ে নেওয়াটা কৃতিত্বের। ছবির শেষদিকে মারামারির দৃশ্যটা আরও একটু বিশ্বাসযোগ্য হলে ভাল লাগত।

ছবিটির মূল গল্প শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের। গল্পের মেজাজ এবং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প বলার সহজিয়া কায়দা, তাকে সম্পূর্ণ অটুট রেখেছিলেন ঋতুপর্ণ। কিন্তু মূল লেখার রস সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখেও ঋতুপর্ণ যে হীরের আংটি তৈরি করেছিলেন সেটি নিজেই এক শিল্পিত ট্রান্সক্রিয়েশন৷ চন্দ্রিল ভট্টাচার্য এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-- আজকাল তো চলচ্চিত্র বিনোদন-সর্বস্ব হয়ে উঠেছে, সেখানে ঋতুপর্ণ ঘোষ এমন একজন পরিচালক ছিলেন, যিনি বলতেন-- হ্যাঁ, বিনোদনটা জরুরি, কিন্তু তার সঙ্গে শিক্ষা, রুচিবোধ এগুলোও জরুরি৷ রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হবে, মহাভারতটাও পড়া থাকলে ভাল হয়৷ শিক্ষার এই বিবিধ ধারা আর শিল্পের মেলবন্ধন ঘটেছিল হীরের আংটি ছবিতে যা আরও পরিণত রূপ পেয়েছিল ঋতুপর্ণর পরবর্তী ছবিগুলোতে।

হীরের আংটি ভীষণ দামি। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে বাংলা সিনেমহল পেয়েছিল এমন হীরের আংটি। সিনেমাকে যে-কোনো মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, সত্যজিৎ রায়ের পর এমন করে আর কেউ দেখাতে পারেনি। আজ চার বছর হল বাংলা ছবি তাঁর হীরের আংটি হারিয়েছে।


ইউটিউবে দেখুন হীরের আংটি



#HirerAngti #RituparnoGhosh


1
রাতে 'কুপিয়ে' খুন হলেন দু’জন, মোতায়েন বিশাল পুলিশবাহিনী

Popular News

816

2
কফিনবন্দি দেহ ফিরল মালদায়, স্যালুট জানিয়ে শেষ শ্রদ্ধা পুলিশের

Popular News

901

3
গঙ্গায় মিশে যেতে পারে ফুলহর, বাজছে বিপদ ঘণ্টা

Popular News

858

4
আত্মীয়ের বাড়িতে এসে গ্রেফতার বাংলাদেশি

Popular News

1336

5
বাংলাদেশে পণ্য পাঠানো বন্ধ করে দিলেন মহদীপুরের এক্সপোর্টার্সরা

Popular News

901

পপুলার

বিজ্ঞাপন

টাটকা আপডেট
 

aamadermalda.in

আমাদের মালদা

সাবস্ক্রিপশন

যোগাযোগ

স্বত্ব © ২০২০ আমাদের মালদা

  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Pinterest
  • RSS