বিজ্ঞাপন

রাম ভরসা রাম এবং ২০১৮



স্টেশন চত্বরে সে কবে এসেছিল মনে করতে পারে না কেউ, মনে করতে পারে না সে নিজেও৷ বয়সের কোনো গাছ পাথর নেই, কেউ বলে সত্তর, কেউ বলে আশি, লম্বা রোগা চেহারা, এক মাথা নুন মরিচ চুল দেখে ষাট পঁয়ষট্টির বেশি মনে হয় না৷ এ তল্লাটের পুরোনো লোকেরা কেউ বলত তার কুমারী মা তাকে এই প্ল্যাটফর্মে কোথাও রেখে দিয়ে গঙ্গার ওই পারে কাশীতে চলে যান৷ এক সহৃদয় ইংরেজ স্টেশনমাস্টারের চেষ্টায় প্রাণে বেঁচে যায় সে৷ তার বছর খানেক পরেই দেশ স্বাধীন হল৷ সেই স্টেশনমাস্টার সহ প্রায় সমস্ত ইংরেজ ভারত ছেড়ে চলে গেল আর বাচ্চাটা থেকে গেল এখানেই৷ আস্তে আস্তে দেখা গেল তার মাথায় খানিক ব্যামো আছে৷ ফলে অন্য কোনো বাড়িতে আর আশ্রয় জুটল না৷ তারপর থেকে গত কয়েক দশক ধরে এই স্টেশনই তার বাড়িঘর সব৷ যে সে স্টেশন নয় একেবারে মোগলসরাই-- দেশের সম্ভবত সবচেয়ে বড়ো রেল জংশন৷ স্টেশনের সব দোকানদার, হকার, কুলি, কামিন, গ্যাংম্যান, ড্রাইভার, গার্ড, টিকিট চেকার মায় খোদ স্টেশনমাস্টার সবাই চেনে তাকে, সবাই জানে সে খ্যাপা কিন্তু ক্ষতিকারক নয় মোটেই৷ স্টেশন চত্বরের নতুন প্রজন্মের কাছে তাকে নিয়ে পুরোনো গালগল্প সব ফিকে হয়ে আসছে ইদানীং শুধু টিকে আছে নামটা ‘রামভরসা রাম’-- সেই কোন যুগে এক বৃদ্ধ কুলি সর্দার রেখেছিল নামটা দেহাতি ভাষায় (ততদিনে দেহাতি হিন্দিই তারও মুখের ভাষা হয়ে উঠেছে৷ তার মায়ের ভাষা কি ছিল কে জানে): বলেছিল বেটা ভগবান রামের ভরসাতেই ঠিক বেঁচে থাকবি তুই তোকে রামভরসা বলে ডাকবো... কুলি সর্দারের নিজের উপাধি ছিল রাম তখন থেকেই মোগলসরাই স্টেশনের ছেলে বুড়ো সবাই তাকে ‘রামভরসা রাম’ বলেই ডাকে৷ রামভরসা রাম রাতটা প্ল্যাটফর্মেই কাটিয়ে দেয় বারোমাস, সকাল-দুপুর-রাত প্ল্যাটফর্মেই কোনো স্টলে জুটে যায় খাওয়ার, কোথাও চা-পাউরুটি, কোথাও পুরি-সবজি, বরাত ভালো লাগলে হকারের কাছে বিক্রি না হওয়া পরোটা আর আণ্ডা কারি৷ লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রেনে জল দেওয়ার পাইপ খুলে খালি গায়ে স্নান করে সে, কোনো শীতের সকালে অমনভাবে স্নান করতে দেখে কেউ যদি বলে রামভরসা ঠাণ্ডা লাগছে না, সে উত্তর দেয়-- ‘সেকি ঠাণ্ডা পড়ে গেছে নাকি? দেখেছো আমাকে কেউ খবরটা দেয়নি, গতবারও এমন হয়েছিল কেউ জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি ফলে পুরো শীতটা চাদর ছাড়াই পার করেছিলাম পরে খুব ঝামেলা হয়েছিল, ভাগ্যিস এবার তুমি জানালে...’ ইত্যাদি ইত্যাদি৷

বাকি সময়টা রামভরসা সারাদিন ধরে হাঁ করে দেখে কত ট্রেন কত জায়গা থেকে এই জংশনে আসছে, যাচ্ছে, কত লোক নামছে, উঠছে... এসব দৃশ্য বছরের পর বছর ধরে দেখে যাচ্ছে সে, কিন্তু তার ট্রেনে চড়ে কোথাও যাওয়া হয়নি, বস্তুত এই মোগলসরাই স্টেশনের বাইরেই সে পা রাখেনি সেই দুঃখে একেক রাতে প্ল্যাটফর্মের একদম সামনে বা শেষে যেখানে ইঞ্জিন দাঁড়ায়, যেখানটাই প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড় করানো সিমেন্টের ফলকে লেখা থাকে স্টেশনের নাম, যেখানটাই লোক প্রায় থাকে না বললেই চলে৷ সেখানটায় গিয়ে সে ডুকরে কেঁদে ওঠে, স্টেশনের হই হট্টগোল ব্যস্ততা পার করে কারো কারো কানে পৌঁছায় সেই কান্না, যাঁরা তাকে চেনে তারা বোঝে শুরু হল রামভরসার পাগলামো তারপর একসময় আপনা আপনিই থেমে যায় কান্না, কেউ বিশেষ গা করে না, এইভাবেই চলে আসছে বছরের পর বছর৷

এহেন রামভরসাকে একদিন পাঠানো হল আগ্রায়, না তাজমহল দেখতে নয় পাঠানো হল সেখানকার আর এক বিখ্যাত পাগলা গারদে মানে একপ্রকার পাঠাতে বাধ্যই হল স্টেশনের লোকজন৷ কারণ একদিন তার কান্না আর থামল না, যেদিন সকালে উঠে রামভরসা শুনলো আজ সে যে স্টেশনে আছে সেটা মোগলসরাই না সেটা পণ্ডিত দিনদয়াল উপাধ্যায় জংশন, প্রথমে সে লোকের কথা বিশ্বাস করেনি কিন্তু প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে সিমেন্টের ফলকে দেখল লেখা অন্য নাম, তার অক্ষরজ্ঞান নেই কিন্তু এত বছরের অভ্যস্ত চোখ, বেশ বুঝতে পারল ওটা আর যাই হোক মোগলসরাই নয়৷ ::কবে আবার সে মোগলসরাইতে ফিরে যেতে পারবে সেই প্রশ্নের উত্তরও কেউ দিতে পারল না৷ সে তখন চিৎকার করে কেঁদে উঠল আর জনে জনে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লাগল সে কীভাবে এখানে আসল আর কবে, কীভাবে ফিরতে পারবে মোগলসরাইতে, সে জিজ্ঞেস করল কুলিদের, হকারদের, টিকিট চেকারদের ছাড়ল না স্টেশনমাস্টারকেও৷ কিন্তু কারো কাছেই সে বিশ্বাসযোগ্য কোনো উত্তর পেল না, তার কান্না থামল না,অগত্যা স্টেশনের লোকজন যোগাযোগ করল মানসিক রোগের চিকিৎসকদের সাথে, পাগল রামভরসা রাম আর একবার পাগল হল৷ দুএকদিনের মধ্যেই রামভরসা পাড়ি দিল মোগলসরাই থেকে থুড়ি পণ্ডিত দিনদয়াল উপাধ্যায় জংশন থেকে আগ্রা৷ সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল খুব জোর...

এই কাহিনীর উপর যারা সাদাত হাসান মান্টোর এক বিখ্যাত গল্পের সামান্যতম ছায়াও দেখতে পাবেন তাঁদের কুর্নিশ৷ আসলে মান্টো বহুদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর চরিত্রগুলো কিন্তু থেকে গেছে আশেপাশে, হয়তো অন্য দেশকালে, অন্য নামে, কারণ কখনো কখনো কারো কারো কাছে বদলায় না বিপন্নতাগুলো ১৯৪৮ কী ২০১৮৷

#PrintEdition #DebrajRoychaudhuri

বিজ্ঞাপন

MGH
পপুলার
1

জেলায় দ্বিতীয় বইমেলার প্রস্তুতি শুরু

2471

জেলায় দ্বিতীয় বইমেলার প্রস্তুতি শুরু
2

স্থান বদলে শুরু হল মালদা বইমেলা, চলবে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত

3210

স্থান বদলে শুরু হল মালদা বইমেলা, চলবে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত
3

মালদায় শুরু করোনা টিকাকরণ, প্রথম টিকা পেলেন কৃষ্ণা

626

মালদায় শুরু করোনা টিকাকরণ, প্রথম টিকা পেলেন কৃষ্ণা
4

অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মালদায় এল করোনা ভ্যাকসিন

1185

অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মালদায় এল করোনা ভ্যাকসিন
5

বাসের জন্য নতুন স্টপেজ রথবাড়িতে

5939

বাসের জন্য নতুন স্টপেজ রথবাড়িতে
Earnbounty_300_250_0208.jpg
At the Grocery Shop
টাটকা আপডেট

সাবস্ক্রিপশন

স্বত্ব © ২০২০ আমাদের মালদা

  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Pinterest
  • RSS