মালদার স্মৃতিতে সুভাষচন্দ্র



সুভাষচন্দ্র বলদেবানন্দ গিরির জাহাজবাড়িতে এক ঘণ্টা ছিলেন৷ পরে এসে উঠলেন ওল্ড সাকির্ট হাউসে৷ দুপুরে ভোজন করলেন অভিরামপুরে কালীরঞ্জন লাহিড়ির বাড়িতে৷

সুভাষচন্দ্র মালদায় এসেছিলেন ১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে৷ নঘরিয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করতে৷

সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে আসার কৃতিত্ব অতুলচন্দ্র কুমারের৷ তিনি তখন এমএলএ৷ বেশ কিছুদিন যাবৎই তিনি সুভাষচন্দ্রকে মালদায় নিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন৷ সুভাষচন্দ্র অতুলচন্দ্র কুমারকে এক চিঠি দিলেন তাঁব ৩৮/২ এলগিন রোডের বাড়ি থেকে৷ চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৩৮ সালে ৯ জুন৷ সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন---‘বহু বৎসর হইল আমি মালদহ যাই নাই৷ শেষবার যখন যাইবার চেষ্টা করিয়াছিলাম তখন রাজকীয় বাধা আসিয়া পড়িয়াছিল৷ তাই অত্যন্ত আনন্দের সহিত আপনাদের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছি-- তবে নানা কারণে আমি ১১/১২ই তারিখে যাইতে পারিব না৷ যদি আমার সুবিধামতো সময় নির্ধারিত হয়, তাহা হইলে অত্যন্ত আনন্দের সহিত আমি মালদহে যাইব৷’

সুভাষচন্দ্রের এই চিঠিতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে সুভাষচন্দ্র বেশ কিছু বছর আগে মালদহে এসেছিলেন৷ সেটা কবে এবং সেই সময় সুভাষচন্দ্রের ভ্রমণের বিবরণ সংগ্রহ করা মালদহের ইতিহাস গবেষকদের কর্তব্য৷ কারণ এই বিষয়ে কোনো তথ্য পাঠকের জানা নাই৷

যা হোক সুভাষচন্দ্র মালদহে এলেন ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে৷ রাষ্ট্রীয় সম্মেলনের আয়োজন হয়েছিল নঘরিয়ায়৷ প্রায় কয়েক হাজার প্রতিনিধি ছিলেন সেই সম্মেলনে৷ সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে এসেছিলেন কিরণশংকর রায়, মেজর সত্য গুপ্ত৷ জেলার নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রমেশচন্দ্র বাগচী, রমেশচন্দ্র ঘোষ, কৃষ্ণগোপাল সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঝা, ভূপেন্দ্রনাথ ঝা, কালীরঞ্জন লাহিড়ি, সতীশচন্দ্র আগরওয়ালা প্রমুখ নেতৃবৃন্দ৷ এছাড়া নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার ও পাবনার নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী উপস্থিত ছিলেন৷ যুব-ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন শিবেন্দুশেখর রায়, মানিক ঝা, মণি গোস্বামী ও সুধীর চক্রবর্তী সহ আরো অনেকেই৷

এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার এক পটভূমি ছিল৷ ঊনবিংশ শতকের তিনের দশকে কৃষকদের মধ্যে সংগঠন বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছিলেন শরৎচন্দ্র বসু৷ কৃষকদের সমস্যা দূর করার জন্য এই সভার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল৷ সারা ভারত কৃষকসভার প্রথম অধিবেশন হয় ১৯৩৬ সালে লখনডতে৷ ১৯৩৭ সালে এর নাম হল ‘অল ইন্ডিয়া পিজান্ট’স কংগ্রেস’৷ এই বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষকসভার প্রথম অধিবেশন হয় বাঁকুড়ার পত্রসায়রে৷ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বঙ্কিম মুখার্জির মতো বামপন্থী নেতারা এই সম্মেলনে ছিলেন৷

১৯৩৮ এর ১৯ শে মার্চ প্রাদেশিক সভার অধিবেশন হয় দিনাজপুর সাব ডিভিশনের বুড়িডাঙ্গায়৷ প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন৷ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষকসভার তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হল নঘরিয়ায়৷ এই কংগ্রেস প্রথমে ১৯৩৯ সালে মে মাসে ডাকা হয়েছিল (কৃষক সভার ইতিহাস-- আবদুল্লা রসুল)৷

সুভাষচন্দ্র জলপাইগুড়ি যাওয়ার পথে মালদহে এসেছিলেন (স্বাধীনতা আন্দোলনে জলপাইগুড়ি--- এম সান্যাল)৷ সুভাষচন্দ্র মালদহ কোর্ট স্টেশনে নামলেন দুপুরে৷ গোদাগাড়ি ঘাট পেরিয়ে আমনুরা জংশন ধরে মালদহ কোর্ট স্টেশনে এলেন৷ চতুর্দিকে উদ্বেলিত জনতা৷ সাজানো নৌকায় পার হলেন মহানন্দা৷ সদরঘাটে হাজার হাজার মানুষ৷ মাল্যভূষিত সুভাষচন্দ্র হেঁটে চললেন পুড়াটুলি প্রাণনাথ শিব মন্দিরের পাশ দিয়ে৷ মালদহ জিলা সুকলের সার্ধ শতবর্ষ পত্রিকায় প্রয়াত ড. ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় এই যাত্রার বড় প্রাণবন্ত বিবরণ দিয়েছেন তাঁর স্মৃতিকথায়৷

পথের দুপাশে মানুষের ঢল৷ মেয়েরা বাজাচ্ছে শাঁখ, দিচ্ছে উলুধবনি৷ উদ্দীপ্ত চেতনার বীর পুরুষ যেন এগিয়ে চলেছেন বিজয়ীর ভূমিকায়৷ সারাফা ভবনের কাছে বহু মানুষের ভিড়৷ মাইক্রোফোন লাগানো ছিল৷ জনতার অনুরোধে তাঁর দু’চার মিনিটের ওজস্বী ভাষণে শহরের মধ্যভাগ প্রকম্পিত হয়ে গেল৷ বাশুলিতলার কাছে শোভাযাত্রা শেষ হল৷ তিনি বলদেবানন্দ গিরির জাহাজবাড়িতে এক ঘণ্টা ছিলেন৷ পরে এসে উঠলেন ওল্ড সাকির্ট হাউসে৷ দুপুরে ভোজন করলেন অভিরামপুরে কালীরঞ্জন লাহিড়ির বাড়িতে৷

বিকেলে সমগ্র শহর সমবেত হয়েছিল বৃন্দাবনী মাঠে৷ এই মাঠে কত স্বাধীনতা সংগ্রামী বত্তৃণতা দিয়েছেন৷ এবার দিলেন সুভাষ৷ বললেন, ‘সারা পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ আসছে৷ স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ৷ এই সময় আলস্যে কাল কাটানোর নয়৷ দেশবাসীকে একসাথে গর্জে উঠতে হবে৷ প্রস্তুত থাকুন৷’ ভাষণ শেষে তিনি ছুটলেন নঘরিয়ায়৷ সুভাষচন্দ্রকে মাল্যভূষিত করে বরণ করে নিলেন অতুল কুমারের সহধর্মিনী বিজলি প্রভাদেবী৷ সুভাষচন্দ্র কৃষকসভায় আহ্বান জানালেন--- আসন্ন যুদ্ধের পটভূমিতে সংঘবদ্ধ হতে হবে৷ কৃষক দুরবস্থার কথা তিনি দূর করার সিংহনাদ করলেন৷

পরের দিন গোলাপট্টিতে কংগ্রেস অফিসে গেলেন৷ সুভাষচন্দ্রের এক সভার আয়োজন করেছিলেন সতীশচন্দ্র আগরওয়ালা ওল্ড মালদায়৷ নৌকা পার হয়ে যাতায়াতে সময় নষ্ট হবে-- কারণ কানসাট আর নবাবগঞ্জে সুভাষের বড়ো বড়ো সভার আয়োজন করাই ছিল৷ বাধ্য হয়ে তিনি চললেন চাপাইনবাবগঞ্জের পথে৷ ওল্ড মালদার মানুষের হতাশা আর ক্ষোভ সামলেছিলেন সত্য বকশি ও কালীরঞ্জন লাহিড়ি৷ কানসাট আর নবাবগঞ্জের জনসভা শেষ করে সুভাষচন্দ্র যখন চাপাইনবাবগঞ্জ স্টেশনে, তখন তিনি খবর পেলেন জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পট্টভি সীতা রামাইয়াকে হারানোর জন্য গান্ধি মর্মাহত৷ গান্ধি বলেছেন ‘পট্টভি সীতা রামাইয়া কা হার মেরি হার হে৷’ ব্যথিত সুভাষ মালদহের নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ট্রেনে উঠার সময় বললেন, আমি বাপুজিকে জিজ্ঞেস করব, ‘বাপুজি সুভাষের জয় কি আপনার জয় নয়?’ সুভাষ ট্রেনে উঠার পর নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সব৷

#PrintEdition

1
রাতে 'কুপিয়ে' খুন হলেন দু’জন, মোতায়েন বিশাল পুলিশবাহিনী

Popular News

531

2
কফিনবন্দি দেহ ফিরল মালদায়, স্যালুট জানিয়ে শেষ শ্রদ্ধা পুলিশের

Popular News

885

3
গঙ্গায় মিশে যেতে পারে ফুলহর, বাজছে বিপদ ঘণ্টা

Popular News

840

4
আত্মীয়ের বাড়িতে এসে গ্রেফতার বাংলাদেশি

Popular News

1320

5
বাংলাদেশে পণ্য পাঠানো বন্ধ করে দিলেন মহদীপুরের এক্সপোর্টার্সরা

Popular News

896

পপুলার

বিজ্ঞাপন

টাটকা আপডেট
 

aamadermalda.in

আমাদের মালদা

সাবস্ক্রিপশন

যোগাযোগ

স্বত্ব © ২০২০ আমাদের মালদা

  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Pinterest
  • RSS